ঠিক এই মুহুর্তে কলকাতার এক শপিং মলের বাইরে দাঁড়িয়ে অভিমানী প্রেমিকার হাতে চকোলেটের গিফট প্যাক তুলে দিচ্ছে দেরি করে আসা প্রেমিক... ঠিক এই মুহুর্তে দিল্লীর এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে সিঙ্গেল মল্টের সাথে ডার্ক চকোলেট আর তন্দুরি চিকেন সহযোগে পার্টি চলছে... ঠিক এই মুহুর্তে আপনার কন্যাটির মুখে হাসি ফুটেছে সারাদিন পরে... মুখে লেগে আছে কোকোর গন্ধ.... ঠিক এই মুহুর্তে অ্যালি পালাচ্ছে.....চকোলেট ছেড়ে... চকোলেটের গন্ধে বমি পায় তার!
এই পর্যন্ত পড়ে যারা ভাবছেন আমি একটা থ্রিলার লিখছি, অপেক্ষা করছেন একটা চেজ অ্যান্ড রান সাস্পেন্স এর, তারা বরং টিভি খুলে ক্যাডবেরির অ্যাডে মন দিন.... ' সাত সমুন্দর পারকে ম্যায় তেরি পিছে পিছে...'। বাকিরা আমার সাথে চলুন সাত সমুন্দর পেড়িয়ে এক অন্ধকার সফরে। যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ডার্ক চকোলেট... অন্ধকার। এতটাই যেখানে নিশ্বাস নেওয়াও বারণ...
না, অ্যালি পালাতে পারবে না। যেমন পারবে না ১.৮ মিলিয়ন আফ্রিকান শিশু যারা তাদের শৈশব র্যাপিং পেপারে মুড়ে ঢেলে দিচ্ছে আমার আপনার সন্তানের মুখে। আইভরি কোস্ট আর ঘানা। পশ্চিম আফ্রিকার এই দুটো দেশে পৃথিবীর মোট কোকোর ৭০% চাষ করা হয়। কালো মানুষ, কালো মাটি, কালো চকোলেট। কিন্তু অ্যালি কে? কোথা থেকে পালাচ্ছে সে? আসুন, ওর সাথে পরিচয় করা যাক।
অ্যালির বাড়ি মালিতে। পৃথিবীর সবথেকে পিছিয়ে পরা দশটি দেশের মধ্যে একটি। এক মাথা কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, মায়াবী চোখ। রাত্রে আগুনের পাশে বসে বুড়োবাবা মানে অ্যালির ঠাকুর্দা গল্প বলত। এক দৈত্যের গল্প। যে উত্তরের জঙ্গলে থাকে। বাচ্চা দেখলে তার রক্ত চুষে পুতুল বানিয়ে দেয়। ছোট্ট অ্যালি ভয় পেত। একদিন সেই দৈত্য ওকে ধরে নিয়ে গেল সামান্য ৮০ ডলারের বিনিময়ে। তখন ওর বয়স ৫। চমকে যাবেন না বন্ধুরা। শুধু একবার তাকিয়ে দেখুন আপনার শিশুটির দিকে। যাইহোক...
প্রতিদিন হাজার হাজার বাচ্চা পাচার হয়ে যায় মালি, বুরকিনা ফাসো এইসব প্রতিবেশী দেশ থেকে ঘানা, আইভরির কোকো ফার্মগুলোতে। স্কুল, কাজ, ডলারের লোভ দেখিয়ে বা রাস্তা থেকে তুলে আনা হয় বাচ্চাদের। সকাল ছটা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রম করানো হয়। খাদ্য বলতে সস্তার ভুট্টা সেদ্ধ আর কলা। রাত্রে জানোয়ারের মত জানলা দরজা হীন কাঠের আস্তাবলে ফেলে রাখা হয়। কখনো শিকল দিয়ে বেঁধে। তার মধ্যে যারা পালানোর চেষ্টা করে তাদের ভাগ্যে থাকে বেধরক মার। মার খেয়ে বা ধর্ষণে মরে গেলে নদীতে বা কুকুরের মুখে ছুঁড়ে দেওয়া হয় শরীর।
ভয় লাগছে? ঘেন্না লাগছে? আপনার শিশুটির মুখে লেগে থাকা চকোলেটের খয়েরী দাগের দিকে তাকাচ্ছেন? তাহলে আর পড়বেন না। কারণ ইন্টারন্যাশনাল লেবার ল এখানে অকেজো। মায়া, ভালোবাসা নেই এখানে। আছে নৃশংসতা, আছে রক্ত। যা শুকিয়ে কালো হয়ে আছে আপনার ফ্রিজে রাখা চকোলেটে...
বিশ্ববিখ্যাত চকোলেট কোম্পানিগুলো যেমন নেসলে, হার্সেস, মার্স এখান থেকে কোকো কেনে। প্রতিযোগিতার বাজারে কোকোর দাম কম রাখার জন্যই শিশু শ্রমিক দরকার। কারণ ৫-১২ বছর বয়সীরা মজুরী পায় না। তার ওপরে তারা কোকো ফিল্ডের দুর্গম জায়গায় যেতে পারে, যেখানে একটু বড়রা ঢুকতে পারবে না। হ্যা, পোকা, সাপ আর বিছের কামড়ে বেশ কিছু বাচ্চা মারা যায়, কিন্তু তাতে মালিকদের কিছু যায় আসে না। দারিদ্র্য থাকবে, বাচ্চার যোগানও থাকবে। বড় কোম্পানিগুলো চুপ করে থাকবে সস্তায় কোকো পাওয়ার জন্য। আমরাও মজে থাকবো বিদেশী চকোলেটের স্বাদে.... চিয়ার্স!
কোকো ফার্মের শিশু শ্রমিকদের ৪০% মেয়ে। তাদের বয়সন্ধি আসে, যৌবন আসে এই কোকো বাগানেই। এদের অধিকাংশই সারা জীবনে তাদের পরিবারের সাথে দেখা করতে পারে না। কারণ এখানে আসা সোজা, বেরোনো কঠিন না, অসম্ভব। মালিক, ঠিকাদার, সুপারভাইজার, পুলিশ এমনকি মজুরদের যৌনতৃপ্তি মেটায় মেয়েরা। ১১ বছরে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। পাল্লা দিয়ে বাড়ে যৌনরোগ। পচে, গলে যায় শৈশব। স্বপ্নে পোকা আসে, বিষাক্ত ভয়ংকর সব পোকা। খুবলে খায় হৃদয়... চকোলেটি হৃদয়!
কাজের নমুনা? দুর্বল হৃদয়রা পড়বেন না। স্কিপ করে যান। মেছেটে হল এমন একটি ছুরি যা চালালে একটা শিশুকে কিমা বানিয়ে দেওয়া যায় কয়েক মিনিটে। বাচ্চাদের কে মেছেটে ধরিয়ে দেওয়া হয় কোকো বিন পেড়ে সেটাকে বস্তায় পুড়ে ঝাড়াই বাছাই করার জন্য। কারোর আঙুল কাটা যায়, কারোর গায়ে গভীর ক্ষত। ১০ বছরের বাচ্চাকে পিঠে ১০০ কেজির বস্তা নিয়ে চলতে হয়। একটু বিশ্রামের জন্য চাবুকের বাড়ি পড়ে
কি ভাবছেন? মধ্যযুগ? না স্যার। এই ফেসবুকের যুগেই এই ক্রীতদাস প্রথা চলছে এবং এই অন্ধকার থেকেই বেরোচ্ছে আমার আপনার প্রিয় ডার্ক চকোলেট...
আমি জানিনা এখনো অ্যালি পালাতে পেরেছিল কিনা! কিন্তু বিশ্বাস রাখি, অ্যালি একদিন পালাতে পারবে। পালিয়ে যাবে অনেক দূর। এবেদি পেলের মত ফুটবলার হবে। শুধু ও না, শেকল খুলে যাবে ওর মত লাখ লাখ বন্দী প্রজাপতির...
হ্যা, একটা কথা বলা হয়নি। অ্যালি চকোলেট খায়নি কোনোদিন। স্বাদ জানে না। সান্তা আসেনা কখনো।
Sunday, 15 July 2018
ডার্ক চকোলেট
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
Popular Posts
-
ঘোষ - ঘোষ মানেই দুধের ব্যবসা, বাড়িতে গরু পোষে । .. সাহা - সাহা মানেই কিপ্টের যম, প্রাণ বেরিয়ে গেলেও হাত থেকে টাকা বেরোবে না । .. মোদক - ...
-
🔴 ভারতে প্রথম রেলপথ প্রস্তাবনা হয় কত সালে - ১৮৩২ সালে 🔵 ১৮৫৩ সালের ১৬ ই এপ্রিল মুম্বাই ও থানের মধ্যে ৪০০ জন যাত্রী ...
-
১. প্রশ্ন : রূপান্তরিত মূল কোনটি? উত্তর : মিষ্টি আলু। ২. প্রশ্ন : পাউরুটি ফোলানোর জন্য কোন ছত্রাক জাতীয় উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়? উত্তর : ঈস...
-
Holiday List for West Bengal Government Employees, 2023 Governor is pleased to declare that the days as specified at List-III may be observe...
-
1 মানব দেহের সবচেয়ে বড় অস্থির নাম কি.? —ফিমার। 2 মানব দেহের সবচেয়ে বড় গ্রন্থির নাম কি.? —যকৃত। 3 মানব দেহের সর্বাপেক্ষা দৃঢ় ও দীর্ঘ অ...
-
ক্লাস টু-তে পিঙ্কী উঠে দাঁড়িয়ে বলছে, 'টিচার টিচার, আমার মা কি প্রেগন্যান্ট হতে পারবে?' টিচার বললেন, 'তোমার মার বয়স কত সোনা?...
-
দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে বঙ্কুবাবু হোয়াটস আপে প্রাপ্ত সানি লিওনের ভিডিও বউ চম্পা কে পাঠিয়ে তার তলায় অল্প শব্দে লিখে দিলেন “ সানি কে ...
-
১ পনেরই আগস্ট সকাল সকাল ফোনটা পেলাম । এক বন্ধু ফোন করেছে । ফোন তুলতেই বললো , "Happy Independence Day" আমি বললাম, "আজ তো ছুটি।...
-
Sunil Gavaskar recently went on an Australia tour where he was invited for the screening of an Australian movie named "Gavaskar" H...
-
অনেক রাত...। ছেলেটি মেয়েটিকে মেসেজ করল ----- ইয়ে.. মানে তুমি মাইন্ড করতে পারবে না কিন্ত। - OK.. বলুন। - পছন্দ না হলেও ব্লক করে দিয়ো না প্ল...
No comments:
Post a Comment